মেকআপ শব্দটা শুনলেই আমাদের মাথায় আগে আসে, একটা মসৃণ, নিখুঁত মুখ, আকর্ষণীয় চোখ, আর উজ্জ্বল ঠোঁট। তবে মেকআপ মানেই কি শুধু সৌন্দর্য বৃদ্ধি? না, মেকআপ শুধু সৌন্দর্য বাড়াতে নয়, এটি আমাদের ব্যক্তিত্ব ও আত্মবিশ্বাস প্রকাশের একটি মাধ্যম।
মেকআপ মানে শুধুই মুখে নানান দামি পণ্য ব্যবহার নয়, মেকআপ আমাদের সৃজনশীলতা ও আত্মপরিচয়ের একটি প্রতিচ্ছবি। ত্বকের অসমতা ঢাকতে, রঙের বৈচিত্র্য ফুটিয়ে তুলতে, ও নিজের ইচ্ছামতো বিভিন্ন লুক তৈরি করতে মেকআপ করা হয়। মেকআপ আত্মবিশ্বাস বাড়াতে একটি উপযুক্ত সমাধান, আজকের যুগে মেকআপ শুধু সৌন্দর্য নয় একটি একটি আর্ট ফর্ম হিসেবে বেশি প্রচলিত রয়েছে।
মেকআপ কি? কেনই বা মেকআপ করা হয় ?
মেকআপ হলো বিভিন্ন পণ্য ব্যবহারের মাধ্যমে ত্বক, চোখ, ঠোঁট, ও মুখের অন্যান্য অংশ সাজানো ও সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলা। এটি ত্বকের টোন, ত্বকের দাগ, ও চেহারার আকৃতি পরিবর্তন করতে সাহায্য করে। কিন্তু প্রশ্ন হলো মেকআপ করা হয়? মেকআপের ব্যবহার করা হয়ঃ-
- ত্বকের অসমতা দূর করতে।
- চেহারার কিছু বৈশিষ্ট্য যেমন গাল ও ঠোঁট ফুটিয়ে তুলতে।
- বিশেষ কোনো জায়গা বা অনুষ্ঠানে নিজেকে পারফেক্ট লুক দিতে।
- নিজেকে সবার কাছে সুন্দর ভাবে প্রকাশ করতে ও আত্মবিশ্বাস বাড়াতে।
- নিজের অভ্যন্তরীণ শৈল্পিক অভিব্যক্তি প্রকাশ করতে।
মেকআপের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস
মেকআপের শুরু এর ইতিহাস পাওয়া যায় খ্রিষ্টপূর্ব ৪০০০ সাল থেকে, মিশরীয় রাণীরা চোখের চারপাশে কালো কোহল (Kohl) ব্যবহার করতেন, যা আজকের আইলাইনারের পূর্বসূরী। এটি শুধু চোখের সৌন্দর্যের জন্য নয় এটি সূর্যের রশ্মি থেকেও চোখ বাঁচাতো। প্রাচীন রোমান ও গ্রিক এর মহিলারা নিজেদের ত্বককে ফর্সা দেখাতে সিসা মেশানো পাউডার ব্যবহার করতেন, যা আজকের ফাউন্ডেশনের কাজ করে। আর জাপানিজরা সাদা পাউডার, লাল লিপস্টিক ও আইলাইনার ব্যবহার করতেন।
আধুনিক যুগের মেকআপ
১৯২০ দশকের হলিউড সিনেমার উত্থানের সাথে সাথে মেকাপেরও জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। তখন মেকআপের জনপ্রিয় ব্র্যান্ডগুলোর উথান হতে থাকে, তখন থেকেই এসব ব্র্যান্ড বাণিজ্যিকভাবে মেকআপ উৎপাদন শুরু করে।
নতুনদের জন্য মেকাপের বেসিক টিপস ও গাইড
যারা মেকআপ জগতে নতুন বা মাত্র মেকআপ করা শুরু করছেন তাদের জন্য মেকআপ একটু বিভ্রান্তিকর হতে পারে। কীভাবে ফাউন্ডেশন লাগাবো? কোন ব্রাশটা ব্যবহার করবো? কনসিলার কোথায় ব্যবহার করবো আরও কতো কি। নিচে কিছু বেসিক টিপস ও গাইড দেয়া হলো যা আপনাদের মেকআপ শুরুর জন্য সাহায্য করবেঃ-
স্কিন টাইপ অনুযায়ী প্রোডাক্ট বেছে নিন
মেকআপের আগে নিজের স্কিন টাইপ চিনা খুবই জরুরি আমাদের প্রত্যেকের স্কিন টাইপ আলাদা আলাদা, কারও শুষ্ক, তৈলাক্ত, মিশ্র বা সেনসিটিভ। স্কিন অনুযায়ী সঠিক মেকআপ পণ্য বাছাই করাটা খুবই জরুরি।
শুষ্ক ত্বক
শুষ্ক ত্বকের জন্য হাইড্রেটিং বা ডিউই ফিনিশ ফাউন্ডেশন বেছে নিন, এতে আপনার ত্বক মেকআপের সাথে সাথে হাইড্রেটেড ও থাকবে। ব্লাশ ও হাইলাইটার এর জন্য ক্রিম বেসড বেছে নিন যাতে স্কিনে একটি গ্লোয়িং ইফেক্ট আসবে।
শুষ্ক ত্বকের মেকাপের জন্য ম্যাট পাউডার এড়িয়ে চলুন এটি ত্বককে আরও ড্রাই বা শুষ্ক করে দেয়।
তৈলাক্ত ত্বক
তৈলাক্ত ত্বকের জন্য ম্যাট ফিনিশ ফাউন্ডেশন ব্যবহার করুন, এটি ত্বকের অতিরিক্ত তেল নিয়ন্ত্রণ করে। প্রাইমার এর ক্ষেত্রে অয়েল-ফ্রি নিন যা মেকআপ দীর্ঘ সময় পর্যন্ত থাকতে সাহায্য করে। ফাউন্ডেশনের পরে কমপ্যাক্ট পাউডার ব্যবহার করুন যাতে মেকআপ গলে না যায়।
সেনসিটিভ ত্বক
সেনসিটিভ ত্বক খুবই সংবেদনশীল হয়, তাই সেনসিটিভ স্কিনের ক্ষেত্রে বিশেষ যত্ন দেয়া লাগে। অবশ্যই খেয়াল করে পারফিউম-ফ্রি ও অ্যালকোহল-ফ্রি মেকআপ প্রোডাক্ট ব্যবহার করুন। মিনারেল মেকআপ পণ্য ব্যবহার করুন যা সেনসিটিভ ত্বকের জন্য নিরাপদ। খুব ভারী মেকআপ এড়িয়ে চলুন, ভারী মেকআপ সেনসিটিভ ত্বকে অনেক বেশি ব্রণ উঠানো শুরু করে।
সঠিক ব্রাশ ও স্পঞ্জ ব্যবহার
একটি ভালো মেকআপের জন্য সবচেয়ে বড় জরুরী বস্তু কি? উত্তরটা হলো ব্রাশ ও স্পঞ্জ। কখন কোনটা ব্যবহার করবেন?
ফাউন্ডেশনের জন্য
- ফাউন্ডেশনের সময় ব্রাশ ব্যবহার করলে কভারেজ বেশি থাকবে তবে খুব ভালোভাবে ব্লেন্ড করতে হবে
- স্পঞ্জ বা বিউটি ব্লেন্ডার মেকআপের সময় চেহারাতে খুব সুন্দর ন্যাচারাল ফিনিশ দেয়
আইশ্যাডোর জন্য
- আইশ্যাডোর ব্লেন্ডের জন্য ফ্লাফি ব্রাশ ব্যবহার করুন, যা ত্বকে হারশ লাইন ফালায় না
ব্লাশ ও হাইলাইটারের জন্য
- বড় এবং নরম ব্রাশ ব্লাশের জন্য সবচেয়ে বেশি উপযোগী
- ফ্যান ব্রাশ বা ছোট হাইলাইটিং ব্রাশ মেকআপের উজ্জ্বলতা আরও বাড়িয়ে তোলে
অতিরিক্ত মেকআপ ছাড়া স্বাভাবিক সৌন্দর্য
মেকআপের আসল উদ্দেশ্য হলো নিজের সৌন্দর্যকে আরও ফুটিয়ে তোলা। তবে অতিরিক্ত মেকআপ চেহারার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য লুকিয়ে ফেলে। তাই কিছু কিছু জিনিস মেনে চললেই নিজের সাথে মেকআপ আরও ভালো লাগবে।
- চেহারাতে বেশি কভারেজ থেকে বিরত থাকুন, এবং নিজের স্বাভাবিক সৌন্দর্যকে ফুটিয়ে তুলুন।
- আইব্রো অতিরিক্ত কালো বা অন্যান্য রং না করে একটু ন্যাচারাল রাখার চেষ্টা করুন।
- চেষ্টা করুন হালকা হাইলাইটার বা ব্লাশ ব্যবহার করার, এতে চেহারায় একটি প্রাকৃতিক উজ্জ্বলতা আসে।
- বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া ওয়াটারপ্রুফ মেকআপ না ব্যবহার করাই ভালো, এতে ত্বক একটু বিশ্রাম পাবে।
উপসংহার
মেকআপ শুধু আমাদের রূপচর্চা এর জন্য নয়, এটি নিজেকে প্রকাশ করার একটি উপায়ও। অনেকে মেকআপ করেন তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়াতে, অনেকে করেন শৈল্পিক সত্তা ফুটিয়ে তুলতে। মেকআপ নিজেকে সুন্দর করে প্রকাশ করার সাথে সাথে ব্যক্তিত্ব এবং আবেগ ফুটিয়ে তোলে। নতুন মেকআপ শুরুর পূর্বে ধাপে ধাপে শিখুন ও মেকআপের সাথে নিজের সৌন্দর্যকে আরও বেশি ফুটিয়ে তুলুন।