আপনার মুখ কি সারাক্ষণ তৈলাক্ত বা তেলতেলে থাকে? ত্বকের চিটচিটে ভাব লাগে? এটি আমাদের সকলের একটি সাধারণ সমস্যা, তবে এটি ঠিক করা সম্ভব। কিছু সহজ টিপস ও ঘরোয়া উপায় অনুসরণ করলেই সহজেই এই সমস্যা হতে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।
তৈলাক্ত ত্বকের কারণে আমাদের মুখে মেকআপ নষ্ট হয় ও চেহারাতে একটা বিরক্তি কর ভাব চলে আসে। সাথে বাংলাদেশের আবহাওয়া এই সমস্যা আরও বাড়িয়ে তোলে। আমাদের আজকের আলোচনা মুখের তৈলাক্ত ভাব দূর করার ঘরোয়া উপায়।
আমাদের বাসায় থাকা কিছু সাধারণ জিনিসপত্র দিয়েই এই সমস্যার সমাধান করা যায়, আসুন শুরু করা যাক।
তৈলাক্ত ত্বক কেন হয়?
প্রথমে কথা বলা যাক আমাদের ত্বক তৈলাক্ত কেন হয়? কেনই বা আমাদের মুখ অতিরিক্ত তৈলাক্ত হয়? মুখে তৈলাক্তভাব কোনো রোগ নয়, আমাদের শরীরের কিছু অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক কারণে এমনটা ঘটে। হরেক রকমের কারণের মধ্যে কিছু কারণ নিম্নে দেয়া হলোঃ-
মুখের তৈলাক্ত ভাবের কারণসমূহঃ-
- হরমোনালান পরির্বতনের কারনে: আমাদের কৈশোর কালে হোরমোনের তারতম্যের কারণে ত্বকের স্বাভাবিক সিবাম উৎপাদন বেড়ে যায়, যার ফলে ত্বকের তৈলাক্ত ভাব বেড়ে যায়।
- বংশগত কারণ: অনেকের মুখের তৈলাক্ততা বংশগত কারণেও হয়ে থাকে। যদি আপনার পরিবারের কারো ত্বক তৈলাক্ত হয় থাকে তবে আপনারও থাকতে পারে।
- মাত্রাতিরিক্ত মেকআপের ব্যবহার: ভারী মেকআপ ও অতিরিক্ত তেল সমৃদ্ধ মেকআপ ব্যবহারে ত্বকের সিবাম বেড়ে যায়, যাতে ত্বকে তেলের প্রভাব অনেক বেড়ে যায়।
- খাদ্যাভাস ও পানি পান না করা: অতিরিক্ত তেল সমৃদ্ধ খাবার, মসলাযুক্ত খাবার, ও প্রক্রিয়াজাত খাবার আমাদের ত্বকের তৈলাক্ত ভাব দূর করে। সাথে পানি কম পান করলে বা শরীরে হাইড্রেশন কমে গেলে সিবাম বেড়ে যায়, যাতে ত্বক হয়ে উঠে আরো অনেক তৈলাক্ত।
ঘরোয়া উপায়ে মুখের তৈলাক্ত ভাব দূর করবেন যেভাবে
আমাদের রান্নাঘরে থাকা কিছু সাধারণ প্রসাধনী দিয়েই মুখের অতিরিক্ত তৈলাক্ত ভাব নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। নিচে এমন কিছু সহজ ও কার্যকর ঘরোয়া সমাধান দেওয়া হলো, যা আপনি আপনার ত্বকের ব্যবহার করতে পারেন।
১. বেসন ও হলুদের ফেস প্যাক
বেসন ও হলুদ প্রাকৃতিক উপাদান, যা খাবার এর পাশাপাশি আমাদের ত্বকের জন্যও অনেক উপকারী হিসেবে কাজ করে। বেসন ত্বকের অতিরিক্ত তেল শোষণ করে ও হলুদ ত্বককে উজ্জ্বল করতে সাহায্য করে।
কীভাবে বানাবেন?
- ২ টেবিল চামচ বেসনের সঙ্গে আধা চামচ হলুদ মিশিয়ে নিন।
- কয়েকফোটা গোলাপ জল বা দুধ যেটি আপনার কাছে আছে মিশিয়ে নিতে পারেন।
- বেসন, হলুদ ও গোলাপ জল বা দুধ দিয়ে পেষ্ট তৈরি করে নিন।
- সরাসরি মুখে লাগান ও ১৫ হতে ২০ মিনিট অপেক্ষা করুন।
- শুকিয়ে আসলে ঠান্ডা পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন।
এই ঘরোয়া ফেস প্যাকটি সপ্তাহে ২ হতে ৩ বার লাগানোর অভ্যাস করুন, আপনার ত্বক থাকবে তেলমুক্ত ও মসৃণ।
তবে অবশ্যই খেয়াল রাখবেন যেন অতিরিক্ত ব্যবহার না হয়। অতিরিক্ত হলুদের ব্যবহারে ত্বকে হলুদভাব পরতে পারে। তাই অতিরিক্ত ব্যবহার হতে বিরত থাকুন।
২. টমেটোর রস ব্যবহার
টমেটো আমাদের সকলের পরিচিত ও নিত্যদিনের ব্যবহৃত উপাদান। টমেটো আমাদের ত্বকের নানান কাজে ব্যবহার করা যায়, এর দ্বারা ত্বকের তৈলাক্ত ভাব ও দূর করা যায়। টমেটো তে থাকা লাইকোপিন উপাদান ত্বকের তেল নিয়ন্ত্রণ করে।
কিভাবে ব্যবহার করবেন?
- একটি স্বাস্থ্যকর টমেটো বাছাই করে নিন।
- ঘরে থাকা ব্লেন্ডার দিয়ে অথবা পিষনি দিয়ে পিষে রস বের করুন।
- তুলার সাহায্যে সে রস আপনার ত্বকের লাগান।
- ১৫ – ২০ মিনিট অপেক্ষা করুন ও পরর্বতীতে কুসুম গরম পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন।
নিয়মিত এর টমেটোর রস ব্যবহারে ত্বকের তৈলাক্ত ভাব কমে যাবে ও অতিরিক্ত তেল শোষণ করে নিবে।
টমেটোর রস ত্বককে খানিকটা রুক্ষ করে দিতে পারে তাই ব্যবহারের পর ত্বক মইশ্চারাইজ করুন।
৩. অ্যালোভেরা জেল ব্যবহার
অ্যালোভেরা ত্বকের জন্য অনেক কাজে ব্যবহার করা হয়। এটি একটি প্রাকৃতিক উপাদান যা ত্বকের জন্য অনেক উপকারী। অ্যালোভেরা আমাদের ত্বককে শীতল রাখে ও ত্বকের অতিরিক্ত তেল শোষণ করে নেয়।
কিভাবে ব্যবহার করবেন?
- একটি তাজা অ্যালোভেরা বেছে নিন ও পাতা কেটে ভিতর থেকে জেল বের করে নিন।
- সরাসরি জেলটি মুখে লাগান ও ২০ মিনিট অপেক্ষা করুন।
- ২০ মিনিট পরে ঠান্ডা পানি দিয়ে মুখ ধুয়ে ফেলুন।
- সব থেকে ভালো ফলাফল পাওয়ার জন্য রাতে ঘুমানো আগে ব্যবহার করুন।
অ্যালোভেরা আমাদের ত্বকে অনেক উপকারী কাজ করলেও এর বেশি ব্যবহার ত্বককে শুষ্ক করে ফেলে। তাই অতিরিক্ত ব্যবহার হতে বিরত থাকুন এবং ব্যবহারের পর ত্বক মইশ্চারাইজ করুন
৪. মধু ও লেবুর মিশ্রণ
মধু ও লেবু ত্বকের যত্নে অনেক আগের একটি উপাদান। মধু ত্বককে প্রাকৃতিকভাবে ময়েশ্চারাইজ করে ও লেবুতে থাকা সাইট্রিক অ্যাসিড তেল নিয়ন্ত্রণ করে।
কিভাবে ব্যবহার করবেন?
- ১ টেবিল চামচ মধু নিন ও অর্ধেক লেবুর রস বের করুন।
- মধু ও লেবুর রস মিশিয়ে নিন।
- মিশ্রণটি মুখে লাগান ও ১৫ মিনিট অপেক্ষার পরে ভালো করে ধুয়ে ফেলুন।
এই প্রাকৃতিক মিশ্রণ এর ব্যবহারে আপনার ত্বক থাকবে তেল মুক্ত, মসৃণ ও উজ্জ্বল।
তবে অনেকের মধুতে অ্যালার্জি থাকতে পারে, তাই নিয়মিত ব্যবহারের আগে ছোট অংশে পরীক্ষা করে দেখুন।
মুখের তৈলাক্ত ভাব দূর করার ঘরোয়া উপায় হিসেবে কিছু সহজ নিয়মিত টিপস
- দৈনিক অন্তত ২ থেকে ৩ বার ত্বক পরিষ্কার করুন।
- তৈলাক্ত ত্বকের জন্য কিছু বিশেষ ফেসওয়াশ রয়েছে, বাছাই করে ব্যবহার করুন।
- বাহিরে বের হওয়ার আগে সূর্যের ক্ষতিকারন বেগুনি রশ্মি থেকে বাঁচতে সানস্ক্রিন ব্যবহার করুন, তবে খেয়াল রাখবেন যেন তেলমুক্ত সানস্ক্রিন হয়।
- দৈনিক পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করুন ও স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ করুন।
- প্রতি সপ্তাহে একবার স্ক্রাব ব্যবহার করুন।
উপসংহার
নিয়মিত যত্নে ত্বকের তৈলাক্ত ভাব দূর করা ও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। যদি নিয়মিতভাবে আমরা আআদের ত্বকের যত্ন নিতে সক্ষম হই তবে আমাদের ত্বকে স্বাভাবিক উজ্জ্বলতা ফিরে পাবে ও স্বাস্থ্যকর থাকবে। উপরে আলোচনা করা ঘরোয়া পদ্ধতিগুলো চেষ্টা করে দেখুন আপনার ত্বকের অতিরিক্ত তৈলাক্ততা কমে যাবে ও চেহারায় ফিরে আসবে স্বাভাবিক জেল্লা।